www.szamin.com


কালিহাতী উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউএনও’র লুটপাটের তদন্তে দুদক


  কামাল হোসেন, ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল): | ২০ আগস্ট ২০১৭, রবিবার, ১:৫৩ | সারাদেশ 


টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে টিআর-কাবিখার বিশেষ বরাদ্দের পৌনে দুই কোটি টাকা লুটপাটের ঘটনায় দীর্ঘ দিন পর কালিহাতী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোজহারুল ইসলাম ঠান্ডু ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু নাসার উদ্দিনের বিরুদ্ধে তদন্তে মাঠে নেমেছে দূর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের অভিযোগের প্রেক্ষিতে এ তদন্ত শুরু হয়েছে।
সরজমিন জানা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে টিআর ও কাবিটা খাতে ১৪৫টি প্রকল্পের বিপরীতে এক কোটি ৭৫ লাখ ৭ হাজার ১৫৪ টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। ওই সময় এ আসনে এমপি না থাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু নাসার উদ্দিন ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোজহারুল ইসলাম তালুকদার ঠান্ডু ওই প্রকল্পগুলো সমন্বয় করেন। এসব অনিয়মের ঘটনায় জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম গত বছরের ১০ ই অক্টোবর ঢাকা দূর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি অভিযোগ দায়ের করেন। তার অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ১৬ ও ১৭ আগষ্ট দুর্নীতি দমন কমিশন মোট ১২ টি প্রকল্প তদন্ত করার উদ্দেশ্যে অভিযোগকারী জাহাঙ্গীর আলমকে সরেজমিনে উপস্থিত থাকতে পত্র প্রেরণ করে। পত্রের প্রেক্ষিতে জাহাঙ্গীর আলম দুদকের তদন্ত টীমের সাথে কালিহাতী শফি সিদ্দিকী চত্বরে উপজেলা আওয়ামীলীগের কার্যালয়ে উপস্থিত হন। সংশ্লিষ্ট প্রকল্প সভাপতিগণ এবং উপজেলা চেয়ারম্যানের লোকজন দূর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তাদের সামনেই জাহাঙ্গীর আলমকে মারপিটসহ হেনস্থা করার চেষ্টা করা হয়। এমতাবস্থায় জাহাঙ্গীর আলম কৌশলে কালিহাতী থেকে পালিয়ে আত্মরক্ষা করে। এ ঘটনায় দুদক কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত ১৬ই আগষ্ট বুধবার দুদকের তদন্তকারী টিম বঙ্গবন্ধু স্মৃতি পাঠাগরের ঘর উন্নয়ন, কালিহাতী স্কাউট ভবনের মাঠ ভরাট, স¤প্রসারণ ও সংস্কার, বেতডোবা মেঘাখালী নদীর পাড়ে প্যালাসাইডিং ও মাটি দ্বারা সংস্কার প্রকল্প, কালিহাতী কাঁচা বাজারে গনশৌচাগার নির্মাণ ও সাতুটিয়া গোরস্থানে মাটি দ্বারা গর্ত ভরাট প্রকল্প, বাঘুটিয়া পাথালিয়া পাকা রাস্তার নিকট হতে পাথালিয়া উচ্চ বিদ্যালয় পর্যন্ত রাস্তা মেরামত প্রকল্প, ভদ্রবাড়ি পুকুর পাড় থেকে ইয়াছিন মেম্বারের বাড়ি পযন্ত রাস্তা মেরামত প্রকল্প এবং ১৭ই আগষ্ট বৃহস্পতিবার চরদুর্গাপুর হানিফের বাড়ি হতে বেড়িপটল নুর ইসলামের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা পুনঃনির্মাণ প্রকল্প, সাভার লতিফের বাড়ি হতে ধলধি জোয়াদ্দারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা পুনঃনির্মাণ প্রকল্প, আলীপুর ব্রীজের নীচে কার্ট অব ওয়াল নির্মাণ প্রকল্প, দৌলতপুর খেলার মাঠ উন্নয়ন প্রকল্প, গোয়ারিয়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা উন্নয়ন প্রকল্প ও কালিহাতী আর এস পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় উন্নয়ন সহ মোট ১২টি প্রকল্প প্রথম দফায় তদন্ত কাজ শুরু করে। তদন্তের প্রথমেই এমন অপ্রীতিকর ঘটনার ফলে বাদী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানা গেছে। ওই স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার বরাবর ১৭ই আগষ্ট বুধবার লিখিত আবেদন করেছেন। এব্যাপারে জাহাঙ্গীর আলম বলেন,‘এ মামলায় সংশ্লিষ্টরা সরকারি কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী রাজনীতিক। এ কারণে আমার নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার আশংকা রয়েছে।’ তদন্তের বিষয়ে দূর্নীতি দমন কমিশনের উপ-সহকারী পরিচালক মোস্তফা বোরহান উদ্দিন আহম্মদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা নিরপেক্ষ তদন্ত কাজ পরিচলনা করার চেষ্টা করছি।’ তদন্ত কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছুই বলতে পারবোনা।
উল্লেখ্য, টিআর এবং কাবিটা কর্মসূচী প্রকল্পের পৌনে দুই কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠে গত বছর। জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগকারী সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর নির্বাচনী এলাকা টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) এমপি কোটায় বিশেষ বরাদ্দকৃত (২য় পর্যায়) ২০১৫-১৬ অর্থবছরে টিআর ও কাবিটা খাতে ১৪৫টি প্রকল্পের বিপরীতে এক কোটি ৭৫ লাখ ৭ হাজার ১৫৪ টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। এ আসনে এমপি না থাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু নাসার উদ্দিন ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোজহারুল ইসলাম তালুকদার ঠান্ডু ওই প্রকল্পগুলো সমন্বয় করেন। বেশিরভাগ প্রকল্পের কোন কাজই হয়নি। আবার কিছু প্রকল্পের কোন অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগীতায় আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতা বরাদ্দকৃত অর্থের বেশিরভাগ টাকাই পকেটস্থ করেছেন। জানা গেছে, স্থানীয় এমপির অনুকূলে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২য় পর্যায়ে টাকার বিনিময়ে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণখাতে ১১৫টি প্রকল্প এবং টাকার বিনিময়ে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার খাতে ৩০টি প্রকল্পসহ মোট ১৪৫টি প্রকল্পে দু’দফায় ৮৭ লাখ ৫৩ হাজার ৫৭৭ টাকা হারে মোট ১ কোটি ৭৫ লাখ ৭ হাজার ১৫৪ টাকা ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ আসে। কিন্তু টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনের এমপি আবদুল লতিফ সিদ্দিকী জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করায় ওই বরাদ্দে কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে বরাদ্দকৃত টাকা হরিলুট হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোজহারুল ইসলাম তালুকদার ঠান্ডু, উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু নাসার উদ্দিন ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আল-আমিন যৌথভাবে বরাদ্দকৃত সমুদয় অর্থ আত্মসাত করেছেন। নামে-বেনামে প্রকল্পের বিপরীতে অর্থ বরাদ্দ দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প সভাপতিদের অজান্তে প্রকল্পের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। কোন নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ৫১টি প্রকল্প তৈরি করে ‘সোলার প্যানেল’ স্থাপনের নামে সরকারি অর্থ অপচয় করেছে। গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের জন্য সরকারের গৃহীত কর্মসূচীকে ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্যক্তি পর্যায়ের প্রকল্পগুলোতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কতিপয় প্রভাবশালী বিত্তবান নেতাকর্মী, কালিহাতী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের কর্মচারীসহ সরকারি কর্মকর্তা, উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যানের ভাইয়ের নামেও বরাদ্দ দিয়ে অর্থ লোপাট করা হয়েছে। টিআর খাতের ১১৫টি প্রকল্পের মধ্যে ৮০নং প্রকল্পটি নাগবাড়ী ইউনিয়নের জনৈক ব্যক্তির বাড়িতে সোলার প্যানেল স্থাপনের জন্য ৫৪ হাজার ৭৫০ টাকা, একই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদকের বাড়িতে সোলার প্যানেল স্থাপনের জন্য ৭৭নং প্রকল্পে ৫০ হাজার টাকা, একইভাবে ৭৬নং প্রকল্পটি উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ তোতার ভাই জয়নাল আবেদীনের নামে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়ে উত্তোলন করা হয়েছে। ৯২নং প্রকল্পে ৩৬ হাজার ৫শ’ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। যিনি কালিহাতী উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক আবু মোহাম্মদ জিন্নাহর বাবা। ১০৫নং প্রকল্পের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি পাঠাগারের ঘর উন্নয়ন (শহীদ শফি সিদ্দিকী চত্বর) ২ লাখ ৬২ হাজার ৫ শত টাকা বরাদ্দ করা হয়। শহীদ শফি সিদ্দিকী চত্ত¡রে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি পাঠাগারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ১০৭ নং প্রকল্পের বেতযোরা মেঘাখালী নদীর পাড়ে প্যালাসাইটিং ও মাটি দ্বারা ভরাটের জন্য ২ লক্ষ ৬২ হাজার ৫ শত টাকা বরাদ্দ দেখানো হলেও ওই প্রকল্পে কোন কাজ করা হয়নি। গ্রামীন অবকাঠামো সংস্কার প্রকল্পের ২২ নং প্রকল্পটিতে দেখানো হয়েছে কালিহাতী স্কাউট ভবন এর মাঠ ভরাট স¤প্রসারণ ও সংস্কারের জন্য ৩ লক্ষ ২১ হাজার ২শত ৮৯ টাকা বরাদ্দ দেখানো হলেও প্রকৃত সত্য হচ্চে যে, স্কাউট ভবন সংলগ্ন কোন মাঠই নেই। একই প্রকল্পের ২৫ নং প্রকল্পটিতে দেখানো হয়েছে যে, কালিহাতীতে কাঁচা বাজার সংলগ্ন গণসৌচাগার নির্মাণ করা হয়নি।



এ বিভাগের আরও খবর















সম্পাদক- লুৎফুন নাহার রুমা
নির্বাহী সম্পাদক- যারিন তাসনীম ঐশী

সম্পাদক বার্তা বিভাগ- কামরুল ইসলাম
ঠিকানা- ২৩/৩ তোপখানা রোড (চতুর্থ তলা), ঢাকা। ফোন- ০১৭১৫১৮৭৩১৮, ০১৭১১১৮১৮৯৩
Email: szaminnews@gmail.com
  Web: www.szamin.com